‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই’
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দেশমাতৃকার প্রতি প্রবল টান। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ কার্যকর করার চেষ্টা চলছিল, তখন তাঁকে দেশ ছাড়তে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। সেই সময়ের সরকার তাঁকে সপরিবারে বিদেশে পাঠানোর সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। মরলে এ দেশের মাটিতেই মরব।’
জেল খেটেছেন, নিজ সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েও সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। খালেদা জিয়া আর নেই, তবে তাঁর উক্তি হয়ে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ।
‘ফিরে দেখা ওয়ান-ইলেভেন’ বইয়ে সাংবাদিক মহিউদ্দিন মোহন লিখেছেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠাতে রাজি করতেই তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের ওপর শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ওপরও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। এর পরও খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েননি। তাঁর ওই অটল থাকার কারণেই ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ থেকে সরে নির্বাচনের দিকে যেতে বাধ্য হয়। ওই সময়ে খালেদা জিয়া ছাড়াও তাঁর দুই সন্তান কারাগারে ছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ওয়ান-ইলেভেনে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চলে যেতে বারবার প্রলুব্ধ করা হয়েছে। কিন্তু দেশের মাটি মানুষকে ছেড়ে তিনি যাননি। আবার ওয়ান-ইলেভেনের সরকার ১৩ শর্তে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিল। কিন্তু শর্তগুলো দেশের স্বার্থবিরোধী হওয়ায় তা তিনি মেনে নেননি।
ওয়ান-ইলেভেনের পর সন্তান, বাড়ি সব হারান। বড় ছেলে তারেক রহমানকেও ১৭ বছর নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। আর নিজে বাংলাদেশের মানুষকে উজাড় করে ভালোবাসার মাশুল দিয়েছেন, কখনও পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত নির্জন এক কারাগারে রাজবন্দি হিসেবে, কখনও হাসপাতালে একজন রাজবন্দির চিকিৎসা না পাওয়ার নির্মম সাক্ষী হয়ে।
১৫ বছরের এক দুঃসাহসিক লড়াইয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক আপসহীন নেত্রী হিসেবে তিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। খালেদা জিয়া ন্যূনতম আপস করলে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম ব্যর্থ হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত, কষ্ট তিনি পেয়েছেন শুধু রাজনীতির জন্য।
যে দেশের জন্য তিনি এত জুলুম, নির্যাতন, গৃহবন্দিত্ব, কারাগার, মামলা, হামলা ভোগ করছেন, সেই দেশেই ৯৩ দিন গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় মৃত সন্তানের কফিন জড়িয়ে খালেদা জিয়ার কান্না দেখেছে পুরো বিশ্ব। তবু তিনি লড়ছেন গণতন্ত্রের জন্য, মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি লড়াই করে গেছেন মানুষের অধিকারের জন্য, একটি নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য। তিনি বিদেশে আয়েশি জীবন বেছে নিতে পারতেন, কিন্তু স্বদেশের ধুলোমাটি আর জীর্ণ কারাগারকেই বেছে নিয়েছিলেন এই আপসহীন নেত্রী।
আওয়ামী লীগ আমলেও তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার কার্যক্রম যখন শেষ পর্যায়ে, তখনও তিনি চাইলে বিদেশ চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে জেল-জুলুমকেই বেছে নিয়েছিলেন। সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে ছেলের জোর চেষ্টা, পুত্রবধূদের আবদার, চিকিৎসকদের আগ্রহ– কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। শেষ সময়ে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে চাননি তিনি। তাই কয়েকবার তাঁর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েও থেমে গেছে। শেষ পর্যন্ত সেই স্বদেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
লেন্দুপ দর্জিও কিন্তু টেকে নাই বেশি দিন
২০১৩ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদরীয় জোট ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসী’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর এই কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তপ্ত রাজনীতিতে বালুর ট্রাকে বন্দি খালেদা জিয়া তার বাসভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে গুলশানে তার ফিরোজা বাসভবনের মূল ফটকের সামনেই তাকে আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্ষুব্ধ খালেদা জিয়া উপস্থিত সংবাদমাধ্যম আর আইনশৃঙখলা বাহিনীর সামনেই বক্তব্য রাখেন প্রায় দশ মিনিট। তার এক হাতে ছিল জাতীয় পতাকা।
কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় রাহান্বিত খালেদা জিয়া বাড়ির উল্টো দিকে অপেক্ষায় থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে অন্য হাত নেড়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রও চাবেন না, দেশ রক্ষা করতেও চাবেন না। গোলামী করবেন? দালালি করবেন? এই গোলামী তো রাখবে না। লেন্দুপ দর্জির (সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী) ইতিহাসটা পড়ে দেখেন। সেও কিন্তু টেকে নাই বেশি দিন। তাকেও বিদায় দিয়েছে। দালালি করে, দেশ বিক্রি করে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। এই দেশ বিক্রি চলবে না হাসিনার।
মূলত, পুলিশ ও অন্যদের সামনে খালেদা জিয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সিকিমের সাবেক নেতা লেন্দুপ দর্জির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। লেন্দুপ দর্জি স্বাধীন রাষ্ট্র সিকিমের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি তার দেশকে ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরে তাকেই ছুড়ে ফেলেছিলো ভারত। আজ সিকিম ভারতের একটি পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তার হারানো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হারানোর করুণ গল্প ইতিহাসের পাতায় এক লজ্জাজনক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়া বলেন, দেশ রক্ষা হবেই, ইনশাল্লাহ। দালালি বন্ধ করতে বলেন। হাসিনার দালালি করে লাভ হবে না। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থাকেন। জনগণের সঙ্গে থাকেন। দেশের মানুষের সঙ্গে থাকেন। তবেই কাজে দেবে। দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে।
